– দীপক সাহা ( পশ্চিমবঙ্গ)
শুরু হয়েছে অম্বুবাচী। চলবে আগামী বুধবার পর্যন্ত। হিন্দু ধর্মে বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক ক্রিয়া, ধর্মকৃত্য বা লৌকিক আচার উদযাপিত হয় যেমন বিভিন্ন ব্রত। আমাদের মধ্যে অম্বুবাচী নিয়ে অনেকরই মনে প্রশ্ন আছে। অম্বুবাচী বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষায় অমাবতি নামেও পরিচিত। অম্বুবাচী কথাটি এসেছে সংস্কৃত শব্দ ‘অম্ব’ ও ‘বাচি’ থেকে। ‘অম্ব’ শব্দের অর্থ হলো জল এবং ‘বাচি’ শব্দের অর্থ হলো বৃদ্ধি। অতএব গ্রীষ্মের প্রখর দাবদাহের পর যখন বর্ষার আগমনে ধরিত্রী সিক্ত হয় এবং নবরূপে বীজধারণের যোগ্য হয়ে ওঠে সেই সময়কেই বলা হয় অম্বুবাচী।
হিন্দু শাস্ত্রে পৃথিবীকে মাতৃস্থানীয় বলা হয়। বেদে এই রকমই বলা হয়েছে তিনি আমাদের মা।পৌরাণিক যুগেও পৃথিবীকে ধরিত্রী মাতা বলা হত। পৃথিবী আমাদের মা, কারণ পৃথিবীতেই আমাদের জন্ম, শুধু আমাদের কেন- ফুল, পাখি, প্রকৃতি এক কথায় সবাই আমরা পৃথিবীর সন্তান।
সূর্যের দক্ষিণায়নের দিন থেকে তিন দিন অর্থাৎ প্রতি বছর আষাঢ়ের ৭ তারিখ থেকে ১০ তারিখের মধ্যে এই পার্বণের পালন কাল। মহাজাগতিক ধারায় পৃথিবী যখন সূর্যের মিথুন রাশিস্থ আদ্রা নক্ষত্রে অবস্থান করে সেদিন থেকে বর্ষাকাল শুরু ধরা হয়। আমরা জানি মেয়েদের ঋতুকাল বা রজঃস্বলা হয় এবং একজন নারী তারপরই সন্তান ধারনে সক্ষম হন। ঠিক তেমনি প্রতিবছর অম্বুবাচীর এই তিনদিনকে পৃথিবীর ঋতুকাল ধরা হয়। এর সাথে প্রাচীন কৃষি ব্যবস্থা জড়িয়ে আছে। এই তিন দিন জমিতে কোন চাষ করা হয় না। বর্ষায় সিক্তা পৃথিবী নতুন বছরে নতুন ফসল উৎপাদনের উপযোগী হয়। উর্বরতা কেন্দ্রিক কৃষিধারায় নারী এবং ধরিত্রী সমার্থক বলে গণ্য করা হয়।
আষাঢ় মাসের শুরুতে পৃথিবী বা বসুমতি মাতা যখন বর্ষার নতুন জলে সিক্ত হয়ে ওঠে তখন তাকে ঋতুমতি নারী রূপে গণ্য করা হয় এবং শুরু হয় অম্বুবাচী প্রবৃত্তি, তার ঠিক তিন দিন পরে সেটা শেষ হয়, সেটা হল অম্বুবাচী নিবৃত্তি। এই নিবৃত্তির পরই প্রাচীন কালে জমি চাষ করত কৃষকেরা। এখনও বিভিন্ন জায়গায় এ নিয়ম রক্ষা করা হয়।
আমাদের “প্রচলিত বিশ্বাস” অনুযায়ী ঋতুকালে মেয়েরা অশুচি থাকে এবং সে সময় তারা মাঙ্গলিক কর্ম থেকেও বিরত থাকেন। একইভাবে পৃথিবী এই অম্বুবাচী বা অমাবতির তিন দিন অশুচি থাকে বলে চিন্তা করা হয়। এ সময় যারা ব্রহ্মচার্য পালন করেন যেমন :ব্রহ্মচারী, সাধু, সন্ন্যাসী, যোগীপুরুষ, বিধবা মহিলা (সেই সব বিধবা মহিলা যারা ব্রহ্মচার্য পালন করেন/আমিষ গ্রহণ করেন না, নিরামিষ খান তারা) এরা কেউই রজঃস্বলা পৃথিবীর উপর আগুনের রান্না কিছু খান না। বিভিন্ন ফলমূল খেয়ে থাকেন এই তিন দিন।
বাঙলা প্রবাদে রয়েছে ‘কিসের বার কিসের তিথি, আষাঢ়ের সাত তারিখ অম্বুবাচী।’ এদিন থেকেই হয় অম্বুবাচী শুরু। অম্বুবাচীর তিন দিন পর্যন্ত কোনো ধরনের মাঙ্গলিক কাজ করা যায়না। চতুর্থ দিন থেকে মঙ্গলিক কাজে কোনো বাধা থাকেনা। অম্বুবাচীর সময় হাল ধরা, গৃহ প্রবেশ, বিবাহ ইত্যাদি শুভ কাজ করা নিষিদ্ধ থাকে ও এই সময়ে মঠ-মন্দিরের প্রবেশদ্বার বন্ধ থাকে।
৭ থেকে ১১ আষাঢ় চার দিন গ্রাম-বাংলার মহিলারা এই অনুষ্ঠান পালন করেন। চাষ বাসের কাজ এই সময় বন্ধ থাকে। এই অনুষ্ঠান উপলক্ষে পিঠা-পায়েস বানাবার রীতি আছে। এই অনুষ্ঠানে বিধবা মহিলারা তিন দিন ধরে ব্রত রাখে। অম্বুবাচীর আগের দিন রান্না করা খাবার তারা তিন দিন ধরে খান। ঐ তিন দিন তারা কোন গরম খাবার খান না।
হিন্দুশাস্ত্র অনুসারে বলা হয়, ধরিত্রী মা ঋতুমতী হওয়ার কারণে ভূমিকর্ষণ ও বৃক্ষরোপণ করা নিষিদ্ধ। মনে করা হয় এই তিন দিনে গৃহ প্রবেশ, বিবাহ ও অন্যান্য শুভ কাজ করা উচিত নয়। যেহেতু এই কয়েকদিন মা ঋতুমতী থাকেন তাই বলা হয় এই সময় যৌন সংসর্গও অনুচিত। মা ঋতুমতী হলে তবেই ধরিত্রী শস্য শ্যামলা হবে, ফসল ফলবে। ধরিত্রী মায়ের সঙ্গে মেয়েদেরও তুলনা করা হয়। সে কারণেই এই কয়েকদিন যৌন সংগম থেকে বিরত থাকাই ভালো। কারণ মেয়েরা ঋতুমতী হলে তবেই সন্তান ধারণে সক্ষম হন। মেয়েরাই তো আলোর উৎস।
মহাভারত , ব্রহ্মাণ্ড পুরাণ , নীল তন্ত্র, রুদ্রযামল , শিবচরিত, শাক্তানন্দ-তরঙ্গিণী এবং মহাপীঠ নিরূপণ ও মঙ্গলকাব্যের সূত্র ধরে বলা যায়, সতীর ৫১ খন্ডের একটি খণ্ড আসামের কামরূপে কামাখ্যা ধামে পতিত হয়েছিল। সেটি হলো সতীর অঙ্গের “যোনি” খণ্ড , তাই এই পীঠস্থান কে শ্রেষ্ঠ পীঠ বলা হয়ে থাকে এবং এর জন্যে কামেশ্বরীও বলা হয়ে থাকে। তাই অম্বুবাচীতে কামাখ্যা ধামে যোনী শিলা হতে এখনো পর্যন্ত অদ্ভুত ধরনের লাল জলের ধারা বইতে দেখা যায় এবং ওই জল ব্রহ্মপুত্র নদে বয়ে যেতে দেখা যায় । ফলে তখন ব্রহ্মপুত্রের জলও লাল হয়ে যায়। তাই এই সময় পৃথিবীর সমস্ত জলরাশি অপবিত্র থাকে। আর এই অম্বুবাচী তিথি পর্যন্ত সর্বত্রই ঝিরিঝিরি বা কখনও মুষলধারে বৃষ্টি হয়। ঠিক যেমনটা হয় রজস্রাবের সময়ে। ভারতের বিভিন্ন জায়গাতে এটা রজোৎসব নামেও পালিত হয়।
প্রায় সব মন্দিরেরই দরজা। এই তিন দিন কামরুপ কামাখ্যায় পূজা হয়। সমস্ত দেবী মন্দির বন্ধ থাকে। কামাখ্যা দেবীর মন্দির এই তিনদিন বন্ধ থাকে। কামাখ্যা মন্দিরে এই উপলক্ষ্যে দেবীর ঋতুকাল সমাগত মনে করে উৎসব পালন করা হয়। কামাখ্যাতে এই সময় বহু সাধুর আগমন হয়। ওড়িশায় এই পার্বণকে সরাসরি ‘রজ উৎসব’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে।
এটা আসলে হিন্দুদের একটা লৌকিক আচার। এই আচারের মূল্য এই যে হিন্দু চিন্তবিদগণ কিছু বিশেষ নিয়ম ও আচারের মাধ্যমে সমাজের জীবন ব্যবস্থায় একটি উন্নত আবহাওয়া ও জলবায়ুগত চিন্তার উপহার দিয়েছেন।
Leave a Reply